অধিকাংশ মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে সেবার নামে কি হচ্ছে?

মাদকাসক্ত-নিরাময়কেন্দ্র
ফাইল ছবি

বিশেষ প্রতিবেদন : দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা বা প্রকৃত পরিসংখ্যান নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কাছে কোন সঠিক তথ্য নেই।

কেউ বলছে, ৩৬ লাখ, কেউ ৬০ লাখ। আর মাদকাসক্তদের বিভিন্ন সূত্র বলছে- দেশের তরুণ প্রজন্মের এক চতুর্থাংশই কোন না কোন ধরনের নেশায় আসক্ত।

মাদকাসক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সরকারি নিরাময় কেন্দ্র বাড়েনি। এদিকে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাড়ছে বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা।

মাদকাসক্তি সম্পূর্ণ নিরাময়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এসব নিরাময় কেন্দ্র তৈরি করা হলেও অনেক কেন্দ্র এখনো অনুমোদন পাইনি।

জানা গেছে, সারা দেশে ৪৪ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে মোটে ৩৫১টি। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪টি। শতাধিক ঢাকায়।

চট্টগ্রামে বেসরকারিভাবে ১৬টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত। ২০ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত কোন নিরাময় কেন্দ্রই নেই।

সারাদেশের অনুমোদনপ্রাপ্ত কেন্দ্রগুলোর মোট শয্যাসংখ্যা ৪ হাজার ৭২৮। এসব কেন্দ্রে সরকারী ১০০ মনোরোগ বিশেষজ্ঞসহ দেশে আছেন মাত্র ২৭০ জন চিকিৎসক। সরকারীভাবে যে চার কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোর অবস্থাও তথৈবচ।

চট্টগ্রামসহ সারাদেশের বেশিরভাগ নিরাময় কেন্দ্রে মাদকাসক্তি শনাক্তে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা নেই। মৌখিক স্বীকারোক্তি অথবা অভিভাবকের কথার ভিত্তিতে রোগী ভর্তি করা হয়। মানসিক রোগীদেরও ভর্তি করা হয় এখানে। মাদকাসক্তি নিরাময়ের জন্য আন্তর্জাতিক চিকিৎসা প্রটোকল প্রতিপালনের বিধান থাকলেও সেগুলোর কোনো কিছুই মানা হয় না।

সাম্প্রতিক সময়ে এধরনের নানা অভিযোগের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কয়েকটি টিম চলতি বছরের শুরু থেকে রাজধানীর অন্তত শতাধিক নিরাময় কেন্দ্র পরিদর্শণ করেন। তদন্তে ১০৫টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০-১৫টি ছাড়া বাকিগুলো নির্ধারিত মানদণ্ডে উন্নীত হতে পারেনি।

প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের দেখা মেলেনি অনেক কেন্দ্রে। অস্বাস্থ্যকর এবং নোংরা পরিবেশ সবখানে। গাদাগাদি করে রাখা হয় রোগীদের। মাদক নিরাময়ের নামে চলছে অপচিকিৎসা।

একই অবস্থা চট্টগ্রামেও :

চট্টগ্রামের নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেও রয়েছে মাদকাসক্ত রোগীদের চিকিত্সা নিয়ে নানান অভিযোগের তীর। বেসরকারি অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রই মানছে না সরকারি শর্ত। রোগীদের সেবার জন্য সার্বক্ষনিক চিকিত্সক ও নার্স থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ কেন্দ্রেই এদের দেখা পাওয়া খুব দুস্কর।

এসব অনিয়ম তদারকির দায়িত্বে থাকা মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে গাফিলতির। অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদন থাকা মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে নানা অনিয়ম-অসঙ্গতি থাকলেও চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে মাদক দ্রব্য নিরাময় অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তারা।

তাদের পরিদর্শন রিপোর্ট বলছে, সব কিছুই চলছে ঠিকঠাক। আর তাই তো শর্ত পূরণ না করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে নিরাময় কেন্দ্রগুলো। অভিভাবকদের প্রশ্ন এত অনিয়ম জেনেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন?

মূলত চট্টগ্রামে প্রতিদিন যে পরিমাণ মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে আসছে সে পরিমাণ সরকারি কোন নিরাময় কেন্দ্র নেই। ফলে এ চাহিদাকে পূঁজি করে সেবা নয় বরং লাভের আশায় চট্টগ্রাম শহরের আনাচে কানাচে একের পর এক গড়ে উঠছে বেসরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র।

ইত্তেফাক এ প্রকিাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের স্বল্পতার কারণে চট্টগ্রামে বেসরকারি প্রায় ১৬টি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রের পরিবেশও ভালো নয়। চিকিত্সা ও কাউন্সিলিংয়ের নামে রোগীদের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও পাওয়া যায়।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সার ক্ষেত্রে সরকারিভাবে কোনো ফি নির্ধারিত নেই। ফলে চিকিত্সা বাবদ রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। এতে অসহায় পরিবারগুলোও চিকিত্সার জন্য কেন্দ্রগুলোর চাহিদা অনুপাতে টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলো সরকারি আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। একটি প্রতিষ্ঠান বছরের সর্বনিম্ন দেড় লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সরকারি আর্থিক অনুদান পেয়ে থাকে।

চট্টগ্রামে বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলো বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সরকারি অনুদান পেয়ে থাকে। তবে সরকারি অনুদান পেতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি শর্ত মেনে চলছে কি না তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকারিভাবে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র পর্যাপ্ত নয়। তাই বেসরকারি এসব নিরাময় কেন্দ্রের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিত্সক নার্সদের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য সরকার অনুদান দিয়ে থাকেন।

মাদকাসক্ত রোগীরা যাতে সুচিকিত্সা পেতে পারেন এটাই সরকারের অনুদানের উদ্দেশ্য। কিন্তু সরকারের এই টাকার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

চমেক হাসপাতালের মানসিক বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবদুল মোত্তালিব গণমাধ্যমকে বলেন, বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলো মেডিক্যাল গাইড লাইন অনুযায়ী চলছে না। ফলে মাদকাসক্ত রোগীরা সঠিক চিকিত্সা পাচ্ছে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রোর উপ-পরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, মাদক সহজলভ্য হওয়ায় আসক্তের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। চট্টগ্রামে আমাদের ২৫ শঘ্যার একটি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে।

প্রতিদিন যে পরিমাণ মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিত্সার জন্য আসছে তাতে কমপক্ষে ১০০ শঘ্যার একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাময় কেন্দ্রের প্রয়োজন বলে মনে করছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রোর উপ-পরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা।

নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে মাদকের জমজমাট কারবার :

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে র‍্যাবের কয়েকটি অভিযানের পর দেখা গেছে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালেই চলতো মাদকের জমজমাট কারবার। সেই সঙ্গে রোগীদের শারীরিক নির্যাতন ও জিম্মি করে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে।

আর এসব অভিযোগে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। আটক করা হয়েছে কেন্দ্রটির নাজনিন ফিরোজা বাঁধনসহ পাঁচজনকে।

র‍্যাব-২ ব্যাটেলিয়ন সদর দপ্তরে এলিট ফোর্সটির মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রটি ছিল মাদক কারবারের আখড়া। নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে সেখানে মাদক কারবার ছাড়াও নানা অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতো।

ভাওয়াল মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্রের মালিক ফিরোজা নাজনিন বাঁধন সেখানে চিকিৎসাধীন তরুণদের অনৈতিক কর্মকান্ডে ব্যবহার করতো। এতে কেউ রাজি না হলে তাদের মাদকের লোভ দেখাতো এবং কেন্দ্রের কর্মীদের দিয়ে নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতন চালাতো।

চিকিৎসার নামে শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করা হতো। রশির সাহায্যে ঝুলিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হতো। রোগীদের থেকে পর্যাপ্ত টাকা নিলেও সে অনুযায়ী সেবা-পরিচর্যা মিলতো না। ছিলো না কোনো চিকিৎসক। নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত রোগী রাখা হয়েছিল সেখানে।

কেন্দ্রটির তিনটি রুমে ২৮ জনকে গাঁদাগাদি করে রাখা হতো। বিভিন্ন সময় সেবা প্রত্যাশীদের মারধর করা ছাড়াও নিন্মমানের খাবার পরিবেশন করা হতো। কিন্তু পরিবারগুলো থেকে প্রথমে ভর্তি ফি তিন লাখ এবং প্রতিমাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। কিন্তু এতো টাকা নেওয়া হলেও সেবার মান ছিল খুবই নিম্নমানের।

নিরাময় কেন্দ্রে দুইজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কোনো চিকিৎসককে সেখানে পাওয়া যায়নি। সেখানে ২০ জন রোগীর চিকিৎসার অনুমোদন থাকলেও ২৮ জন রোগী পাওয়া যায়। নানান অভিযোগের পর র‍্যাবের কয়েক ঘন্টার অভিযানের পর তাৎক্ষণিকভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক-কর্মচারিদরর তাৎক্ষণিক ডোপ টেস্টে প্রমাণিত হয় তারা সবাই মাদকাসক্ত। আসলে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের নামে সেখানে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করা হতো। কেন্দ্রটির মালিক নাজনিন ফিরোজা বাঁধনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে।

ডিখ/প্রিন্স