ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপুজোর প্রচলন ও ইতিহাস

ঢাকেশ্বরী-মন্দির-দুর্গাপুজো-প্রচলন-ইতিহাস

ধর্ম ডেস্ক : ঢাকেশ্বরী মন্দির অন্যতম বাংলাদেশের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির অন্যতম। বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির বলেও ডাকা হয়ে থাকে। ঐতিহ্যবাহী এ মন্দিরটি কীভাবে তৈরি হল, তা নিয়ে প্রচলিত আছে বেশ কিছু গল্প। গল্পগুলোতে পুরাণ আর ইতিহাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মন্দিরের ইতিহাস এখনও রহস্যে ভরা।

জানা যায়, রাজা বল্লাল সেন এক সময়ে বুড়িগঙ্গার নদীর তীরে জঙ্গলে মা দুর্গার একটি মূর্তি খুঁজে পান। সেই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন তিনি। সেই থেকেই এই মন্দিরের নাম ঢাকেশ্বরী মন্দির।

লোককথা অনুযায়ী, রাজা আদিসুর তাঁর এক রানিকে নির্বাসিত করেছিলেন বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জঙ্গলে। সেখানে রানি এক ছেলের জন্ম দেন। সেই ছেলেই বল্লাল সেন।

জঙ্গলের মধ্যেই বড়ো হয়ে উঠতে থাকেন তিনি। জঙ্গলে আচ্ছাদিত একটি দেবীমূর্তি খুঁজে পেয়েছিলেন বল্লাল সেন। তিনি মনে করতে থাকেন, সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে এই দেবী দুর্গাই তাঁকে রক্ষা করছে।

পরে যখন তিনি রাজা হয়ে সিংহাসনে বসেন, যেখানে তিনি ওই মূর্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, সেখানে একটি মন্দির তৈরি করান। জঙ্গলে ঢাকা অবস্থায় মূর্তিটি পেয়েছিলেন বলে মন্দিরের নাম দেন ‘ঢাকেশ্বরী’।

বল্লাল সেনকে নিয়ে আরেকটা গল্প রয়েছে যে রাজা বিজয় সেনের স্ত্রী স্নান করতে লাঙ্গলবন্দ গেছিলেন। ফিরে আসার পথে তিনি এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন, যার নাম হয় বল্লাল সেন। এই বল্লাল সেন পরে রাজা হওয়ার পর নিজের জন্মস্থানে একটি মন্দির তৈরি করেন।

তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর জন্মস্থানে রয়েছে জঙ্গলে আচ্ছাদিত এক দেবীমূর্তি। সেই মূর্তিকেই তিনি মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন। বহু মানুষের বিশ্বাস, এই মন্দিরের নাম অনুসারে ঢাকার নামকরণ হয়।

তবে অনেক গবেষকই মনে করেন, ঢাকেশ্বরী মন্দির যে বল্লাল সেনই তৈরি করেছিলেন, তার সপক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ নেই। কেউ কেউ বলছেন, মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মান সিংহ চারটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এখানে।

জনশ্রুতি আছে যে রাজা মানসিংহ ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখে সংস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন। মন্দির প্রাঙ্গণে তিনি স্থাপন করেছিলেন চারটে শিবলিঙ্গ আর চারটে শিবমন্দির। তবে মানসিংহ যে এই মন্দির সংস্কার করেছিলেন, তারও কোনো সঠিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

এবার ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে নিয়ে পৌরাণিক বিশ্বাস যেটি রয়েছে, তাতে বলা আছে, দক্ষযজ্ঞের পর শিব যখন তাঁর স্ত্রী সতীর দেহ নিয়ে তাণ্ডব করছিলেন, তখন শিবকে থামানোর জন্য বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ৫১টি টুকরো করে দেন।

প্রত্যেকটি টুকরো যে জায়গায় পড়ে, সেখানে একটি করে সতীপীঠ তীর্থ গড়ে ওঠে। মনে করা হয়, ঢাকা অঞ্চলে সতীর মুকুটের ডাক বা উজ্জ্বল গয়নার অংশ গিয়ে পড়ে। সেখানেই দেবীর ঢাকেশ্বরীর আরাধনা করা হয়। ঢাকেশ্বরী মন্দির একটি উপপীঠ।

এদিকে অনেকই বলছেন, ভারতীয় স্থাপত্যে চুন-বালির ব্যবহার শুরু হয়েছে সুলতানি যুগে। ঢাকেশ্বরী মন্দির বানাতে চুন আর বালি কাজে লাগানো হয়েছিল। বাংলায় তাই সেন আমলে এই মন্দির তৈরি হওয়া অসম্ভবই বলা যায়।

মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরি’ বইতে প্রত্যেকটি সুবাহ্‌ বা প্রদেশের চুলচেরা বিবরণ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে এই মন্দিরের উল্লেখ ছিল না। তাই অনেক ইতিহাসবিদের মতে এই মন্দির তৈরি হয়েছিল আকবরের রাজত্ব শেষ হওয়ার পরে।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাঠামোর সঙ্গে মুঘল যুগের মন্দির স্থাপত্যের অনেক মিল আছে। তাই বেশ কিছু গবেষক জানিয়েছেন, মুঘল আমলেই এই মন্দির গড়ে উঠেছিল।

এফ বি ব্রাডলি বার্ট ১৯০৬ সালে তাঁর ‘রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিট্যাল’ নামক গ্রন্থে জানিয়েছেন যে ঢাকেশ্বরী মন্দির ২০০ বছরের পুরনো এবং এটি তৈরি করিয়েছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হিন্দু এজেন্ট।

এখন প্রত্যেক বছর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়। প্রতি বছর পুজোয় এখানে দর্শকদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। মন্দিরের পুরনো শিল্পশৈলীও দেখতে যান দর্শকেরা।

ডিখ/প্রিন্স