পেলে যেসব কারণে সর্বকালের সেরা

পেলে যেসব কারণে সর্বকালের সেরা

খেলাধুলা ডেস্ক : সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবল তারকা পেলের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান গোটা ফুটবলবিশ্ব। এক হাজার ২৮১ গোলের বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন পায়ের জাদুতে।

একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপ জেতা সাবেক ফরোয়ার্ড পেলে ২০০০ সালে ফিফার শতাব্দী সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছিলেন।

অনেকের চোখেই তিনি সর্বকালের সেরা ফুটবলার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘মেইল অনলাইন’ এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে, পেলেকে কেন সর্বকালের সেরা বলা হয়। তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।

সাও পাওলোর দারিদ্র্যপীড়িত বস্তিতে তার জন্ম। সেখানকার রাস্তায় মোজা মুড়িয়ে বল বানিয়ে কিংবা জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলতেন। ঠিক খেলতেন নয়, খেলার পাশাপাশি জাদুকরী সব মুহূর্তের জন্ম দিতেন ওই অল্প বয়সেই।

পরিবারের একটা ফুটবল কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না। কিন্তু ১৫ বছর বয়সে সেই ছেলেটিই সান্তোসের মূল দলে গোলের পর ১৬ বছর বয়সে খেলেছেন ব্রাজিল জাতীয় দলে।

আর ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ৪ ম্যাচে ৬ গোল করে ব্রাজিলকে জিতিয়েছেন বিশ্বকাপ। হয়ে গেলেন সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপজয়ী!

কিন্তু সেটা কেবলই পেলের শুরু। যখন শেষ করেছিলেন, ততদিনে পৃথিবীতে তার মতো আর কেউ নেই।

১৯৫৮ বিশ্বকাপের আগে পেলে চোট পেয়েছিলেন। তার সতীর্থরাই চাপাচাপি করে পেলেকে সুইডেন বিশ্বকাপে নিয়ে যান। সেই বিশ্বকাপে পেলে ৬ গোল করেন। ফাইনালে জোড়া গোল করেছিলেন। ম্যাচ শেষে আনন্দের আতিশায্যে মূর্ছা গিয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সী পেলে।

জ্ঞান ফেরার পর প্রতিপক্ষ (সুইডেন) দলের খেলোয়াড় সিগভার্দ পার্লিং পেলেকে বলেছিলেন— ‘তোমার দ্বিতীয় গোল দেখে করতালি দিতে ইচ্ছে করছিল।’

১৯৬২ বিশ্বকাপে পেলে চোটের কারণে দুই ম্যাচের বেশি খেলতে পারেননি। সেবার ব্রাজিলকে জেতালেন গারিঞ্চা। পরের বিশ্বকাপেও কড়া ট্যাকলের শিকার হয়ে পেলে বিদায় নিলেন প্রথম রাউন্ড থেকে। ব্রাজিলও বিদায় নেয় তার সঙ্গে।

এই চোটের কারণেই ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলের খেলার কথাই ছিল না। কিন্তু এ বিশ্বকাপেই ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র পাসটি ছিল তার পা থেকে। ‘শতাব্দীর সেরা ফুটবলার’ -এর সিগনেচার পাস ছিল সেটি। ইতালির বিপক্ষে সেই ফাইনাল ৪-১ গোলে জিতেছিল ব্রাজিল।

এই ম্যাচে পেলেকে মার্ক করার দায়িত্ব ছিল ইতালির ডিফেন্ডার তারচিসিও বারজিনিচের ওপর। তিনি বলেছিলেন, ‘ফাইনালের আগে আমি নিজেই নিজেকে বুঝিয়েছিলাম, সে (পেলে) আমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। আমি ভুল ভেবেছিলাম।

১৯৭০ বিশ্বকাপের আগে রাজনৈতিক কারণে ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচের পদ থেকে ছাঁটাই হওয়া হোয়াও সালদানাকে ব্রাজিলের এক ক্রীড়ালেখক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ব্রাজিলের সেরা গোলকিপার কে? সালাদানা বলেছিলেন, পেলে।

সেই ক্রীড়ালেখক পাল্টা জানতে চান, বেশ, তা হলে সেরা রাইটব্যাক? এবারও উত্তর এলো, পেলে।

মোটামুটি দলের অর্ধেক পজিশনে পেলের নাম বলার পর সালাদানা খানিক হেসে বলে ফেলেন, পেলে যে কোনো পজিশনেই বিশ্বের সেরা ফুটবলার।

সান্তোস, ব্রাজিল ও নিউইয়র্ক কসমসের হয়ে মোট ৪০ ট্রফি জিতেছেন পেলে। তিনি ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার মিলে ফুটবলের ভিত গড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

উয়েফার সভাপতি থাকতে মিশেল প্লাতিনি একটা মন্তব্য করেছিলেন, ‘ফুটবলার পেলে ও মানুষ পেলে। কিন্তু পেলে যখন ফুটবল খেলেছেন তখন তিনি ঈশ্বর হয়ে উঠেছেন।’

ইতিহাসই সে কথা বলে। সেটা শুধু ১৩৬৬ ম্যাচে ১২৮২ গোলের জন্য নয়, প্রতিভার দ্যুতিতে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্যও নয়। বরং খেলাটির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সেটা পৃথিবীর মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও পেলের কোনো তুলনা নেই। একটা খেলায় একজন অমর কিংবদন্তির কাছ থেকে লোকে আর কি আশা করতে পারে?

গত নভেম্বর থেকে সাওপাওলোর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে ছিলেন ব্রাজিলের ‘কালো মানিক’। জীবনের আঙিনায় আর ফেরা হলো না তার।

দেশের খবর/প্রিন্স